প্রিয় প্রজন্ম || Priyo Projonmo

জিয়ার মা-বাবা’র কবর পাকিস্তানের করাচিতে

ফজলুল বারী

প্রকাশিত: ০৮:২৩, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২২

জিয়ার মা-বাবা’র কবর পাকিস্তানের করাচিতে

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়াউর রহমানের মা-বাবা’র কবর পাকিস্তানে। খালেদা জিয়ার জন্ম ভারতে। জলপাইগুড়িতে। তাদের বড় সন্তান তারেক রহমানের জন্ম করাচিতে। এসব কোন অপরাধ নয়। ভারত বিভাগের সঙ্গে এ অঞ্চলের অনেক জীবন পরিবার এভাবে বিভক্ত হয়েছে।

দোষ হচ্ছে সত্য চেপে যাওয়া অথবা অস্বীকার করা। সংকীর্ন রাজনৈতিক কারনে আমাদের অনেকে সত্য অস্বীকার করেন। অথবা পাকিস্তানপন্থী দল হিসাবে বদনামের কারনে বিএনপির নেতাকর্মীরা বিষয়টি নিয়ে লুকোছাপা করতে পারেন। জিয়াউর রহমানের বাবা’র নাম মনসুর রহমান। মায়ের নাম জাহানারা খাতুন।

ভারত বিভাগের আগে জিয়াউর রহমানের বাবা কলকাতায় এক সরকারি অফিসে কেমিস্ট হিসাবে কাজ করতেন। এরজন্যে জিয়ার স্কুল জীবন শুরু হয় কলকাতার পার্ক সার্কাসের হেয়ার স্কুলে। ভারত বিভাগের পর ভারতের মুসলিম চাকুরেদের বড় অংশ পাকিস্তানে চলে আসেন।

বাঙালি মুসলমানদের বেশিরভাগ চলে আসেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে। জিয়ার বাবা’র মতো অনেকে যান তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে। করাচিতে। কারন তখনও করাচি পাকিস্তানের রাজধানী ছিল। জিয়াউর রহমানের বাবা’র যে পেশাগত যোগ্যতা, তার চাকরির সুযোগ তখন হয়তো পশ্চিম পাকিস্তানেই বেশি ছিল।

১৯৫৮ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের রাজধানী ও বেশিরভাগ বিদেশী দূতাবাস ছিল করাচিতে। পরে সেখান থেকে রাজধানী রাওয়ালপিন্ডিতে স্থানান্তরিত হয়। এরজন্যে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অসহযোগ আন্দোলনের বিশেষ একটি শ্লোগান ছিল পিন্ডি না ঢাকা, ঢাকা-ঢাকা।

১৯৭০ সালে রাজধানী বর্তমান ইসলামাবাদে স্থানান্তরিত হয়। করাচি রাজধানী থাকার সময় পাকিস্তানের জাতির পিতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ’র মৃত্যু হওয়ায় করাচিতেই তাকে সমাধিস্থ করা হয়েছে। বাংলাদেশের অনেক মিডিয়া মাঝে মাঝে গদগদ হয়ে রিপোর্ট করে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর কবরে বাংলায়ও লেখা আছে তার নাম। কিন্তু জিয়াউর রহমানের মা-বাবা’র কবর নিয়ে এখনও কেউ রিপোর্ট করেননি।

ভারত বিভাগের পর পাকিস্তানের চাকরি-বাকরি, অফিস-আদালত পশ্চিম পাকিস্তানেই বেশি ছিল। পূর্ব পাকিস্তানের লোকজনের একটা পাসপোর্ট করতে চাইলেও করাচিতে যেতে হতো বা আবেদন সেখানে পাঠাতে হতো। বেশিরভাগ বিদেশী দূতাবাস করাচিতে থাকায় কেউ কোন দেশে যেতে চাইলে তাদের বেশিরভাগকে ভিসার জন্যে যেতে হতো করাচিতে।

এমন নানান বঞ্চনার কারনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সিংহভাগ জনমত পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে বিষিয়ে ওঠে। পিতার চাকরির সূত্রে জিয়াউর রহমান করাচি গিয়ে সেখানকার একাডেমি স্কুলে ভর্তি হন। সেই স্কুল থেকেই ১৯৫২ সালে তিনি মেট্রিক পাশ করেন। তার বয়সী ছেলেমেয়েরাই তখন দেশে বাংলা ভাষার দাবিতে আন্দোলন করছেন প্রান দিচ্ছেন।

কিন্তু জিয়াউর রহমানের পড়াশুনা বেড়ে ওঠা চলছিল উর্দু-ইংরেজি ভাষায় ও পরিবেশে। ওই সময়ে সেই আন্দোলন তার মাঝে কোন আলোড়ন সৃষ্টি করে থাকলে জিয়া হয়তো পরবর্তীতে তার রাজনৈতিক জীবনে বলতেন বা লিখতেন। যেমন তার মৃত্যুর পর থেকে তার দল দাবি করছে তিনি স্বাধীনতার ঘোষনা দিয়েছিলেন।

যা জিয়ার জীবদ্দশায় নিজে কখনো দাবি করেননি। তার দলও কখনও তা দাবি করেনি তার জীবদ্দশায়। ১৯৫৩ সালে জিয়া করাচির ডি জে কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হন। সে বছরেই কাকুল মিলিটারি একাডেমিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অফিসার ক্যাডেট হিসাবে যোগ দেয়ায় তার পরবর্তী পড়াশুনা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ব্যবস্থাপনাতেই চলেছে।

শিক্ষা জীবন উর্দু-ইংরেজি ভাষায় ও তেমন পরিবেশে বড় হওয়াতে জিয়ার জীবন প্রনালীতে বাঙালিয়ানা ছিলোনা। তিনি প্র্যাকটিসিং মুসলমান ছিলেননা। বাংলায় কথা বলতে পারলেও উচ্চারনে উর্দু একসেন্ট ছিল। বাংলায় লিখতে পড়তে ভালো পারতেননা। এরজন্য ক্ষমতা পেয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বদলে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের কথা তিনি ভেবে থাকতে পারেন।

অথবা এটি প্রতি তার পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার এসাইনমেন্টও হতে পারে। উল্লেখ্য জিয়া ১৯৫৯ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত তিনি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগে কাজ করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়ায় সেনাবাহিনীর অনেক বাঙালি অফিসারের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া হয়।

কিন্তু জিয়াউর রহমান ‘স্বাধীনতার ঘোষনা’ দেয়া স্বত্ত্বেও তার বগুড়ার পৈত্রিক বাড়িতে তেমন কোন আক্রোশের ঘটনা না ঘটেনি। এর নেপথ্য তার পাকিস্তানি সেনা গোয়েন্দা সংস্থায় কাজ করার বিষয়টির কোন যোগসূত্র আছে কীনা তা নিয়ে হয়তো কখনো অনুসন্ধান চালাবে ভবিষ্যত প্রিয় প্রজন্ম।

জিয়াউর রহমান পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থায় থাকাকালীন দিনাজপুরের খালেদা খানমের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। খালেদা জিয়ার সংসার জীবনও শুরু হয় পাকিস্তানে। ১৯৬৭ সালে তাদের বড় সন্তান তারেক রহমানের জন্ম হয় করাচিতে। ১৯৭০ সালে মেজর হিসাবে অষ্টম ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগ দেবার আগ পর্যন্ত জিয়া-খালেদা পাকিস্তানেই ছিলেন।

করাচিতেই জিয়ার মা-বাবা’র স্বাভাবিক মৃত্যু হয়। তাদের সমাহিত করা হয় সেখানেই। কিন্তু পরবর্তীতে জিয়া-খালেদার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের কারনে এই বিষয়টি চাপা দেয়া হয়! বাঙালি মুসলমানদের ঐতিহ্যগত একটি জীবনসূচি হচ্ছে স্বজনের কবর জিয়ারত।

মা-বাবা’র জন্ম-মৃত্যুবার্ষিকী পালন, প্রতিদিন না পারলেও শবেবরাতের রাতে, রোজায়, ঈদে আমরা মা-বাবা’র কবর জিয়ারতের চেষ্টা করি। অথবা দূর থেকে হলেও চেষ্টা করি দোয়ার আয়োজনের। কিন্তু প্র্যাকটিসিং মুসলিম না হওয়াতে এসব নিয়ে জিয়ার কোন আগ্রহ ছিলোনা।

সংবিধানে বিসমিল্লাহ সংযোজনকারী জিয়া প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক থাকাকালীন তিনি রোজাও রাখতেননা। পরবর্তীতে সরকারিভাবে বিভিন্ন সময়ে পাকিস্তানে গেলেও সম্ভবত রাজনৈতিক কারনে জিয়া-খালেদা তাদের মা-বাবা-শশুর-শাশুড়ির কবর জিয়ারতে করাচি যাবার চেষ্টা করেননি!

বিএনপির নেতাকর্মীরা তাদের দলের প্রতিষ্ঠাতার জন্ম-মৃত্যুবার্ষিকীতে নানান আয়োজন করেন। কিন্তু দলের প্রতিষ্ঠাতার মা-বাবা’র জন্য দোয়া-কবর জিয়ারতের উদ্যোগের কথা কখনও জানা যায়নি। অথচ জিয়ার মা-বাবা’র শেষশয্যা দলটির নেতাকর্মীর জন্যে তীর্থস্থান হতে পারতো। কিন্তু তারা বিষয়টি স্বীকারই করেনা! অদ্ভূত রাজনীতি! অদ্ভূত দল!